চট্টগ্রাম বন্দরে সৌরবিদ্যুতের উদ্যোগ, চাহিদা মিটিয়ে বিদ্যুৎ যাবে জাতীয় গ্রিডেও
প্রধান অ্যাডমিন — 2026-10-24T04:21:00.000Z
কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বিদ্যুতে স্বনির্ভর হতে এবার ৮ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে বছরে প্রায় ৫ কোটি টাকা হিসাবে ২০ বছরে সাশ্রয় হবে ১০০ কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) ঘোষণা অনুযায়ী, কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজে কনটেইনার ওঠানো-নামানো এবং পরিবহনের কাজে দিন-রাত সচল রয়েছে ১৮টি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ ১০ ধরনের ১৬৯টি বিশেষায়িত ক্রেন। একই সঙ্গে বন্দরের জেটি ও ইয়ার্ডে কাজ করছে ২২ ধরনের আরও ২৭২টি যন্ত্র। এ ছাড়া বন্দরে রয়েছে ৩০ হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন।
এসব যন্ত্রপাতি ও যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ডিজেল। পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যবহারও রয়েছে। ফলে বন্দরের কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। জাহাজ থেকেও কার্বন নিঃসরণ হয়। আবার বন্দরে যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, তা জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎস থেকে আসে। এটি কোনো সবুজ জ্বালানি নয়।’
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্বন নিঃসরণ বিষয়ক গবেষক ড. মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে বন্দরকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যেতে পারে। জাহাজ বন্দরে প্রবেশের পর মূল ইঞ্জিন বন্ধ রেখে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে জাহাজের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালানো সম্ভব হলে পুরো বন্দরকে সবুজ বন্দরে রূপান্তর করা যাবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ৭ থেকে ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দর। এ জন্য প্রতি মাসে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) ৫০ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করতে হয় বলে জানানো হয়েছে।
কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করাও বন্দরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ লক্ষ্যে বন্দরের বিভিন্ন শেড ও ভবনের ছাদ এবং পরিত্যক্ত জায়গায় সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে কর্তৃপক্ষ। এসব প্যানেল থেকে দিনে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। একই সময়ে বন্দরের বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ৭ মেগাওয়াট। চুক্তি অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে জাতীয় গ্রিডে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরে অনেক ছাদ ও শেড রয়েছে। সেগুলো ব্যবহার করে ২০ থেকে ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘এই বিদ্যুৎ চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবহার করলে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমরা আরও এগিয়ে যাব।’
শুধু বন্দরের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণেই কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে না; পণ্য নিয়ে প্রতিবছর বন্দরে আসা চার হাজারের বেশি জাহাজও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের ঘোষণা অনুযায়ী, কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য পূরণ করতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরকেও।
এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বন্দরে আসা জাহাজগুলোতে সরবরাহ করা গেলে পরিবেশদূষণ কমানোর পাশাপাশি আর্থিকভাবেও লাভবান হতে পারে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের কার্বন নিঃসরণবিষয়ক গবেষক ড. মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর প্রবণতা কমিয়ে দেশকে ভবিষ্যতের সবুজ ও জলবায়ুবান্ধব ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে।’
আগামী মাস থেকেই বন্দরে সোলার প্যানেল স্থাপনের কাজ শুরু হবে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ২০ বছর কারিগরি ও তদারকি সহায়তা দেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি। এ ব্যবস্থায় দিনে সৌরবিদ্যুৎ এবং রাতে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চলবে বন্দরের কার্যক্রম।
দৈনিক রূপালী চট্টগ্রাম