জীর্ণ ভবনের ছাদে ওঠার চেষ্টা গেট তালাবদ্ধ থাকায় যায় প্রাণ হোটেল সৌদিয়ায় আগুনের ঘটনায় আদালতের চার্জশিট

প্রধান অ্যাডমিন — 2026-10-14T04:37:00.000Z

ভবনটি ছিল বহু বছরের জরাজীর্ণ। তাতে আলো-বাতাসও ঢুকত না। ছিল না কোনো জরুরি বহির্গমনের পথও। তবু ঢাকা সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই ওই ভবনে বিভিন্ন দোকান, স্টুডিও, বিউটি পার্লারসহ চালু করা হয় হোটেল সৌদিয়া আবাসিক। ২০২৫ সালের ৩ মার্চ দুপুরে রাজধানীর গুলশান থানাধীন শাহজাদপুর এলাকার এ আবাসিক ভবনে লাগে আগুন। গোল্ডেন টিউলিপ বিউটি লাউঞ্জ নামে ভবনটিতে থাকা পার্লারে ব্যবহৃত পুরোনো ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী থেকে ঘটে আগুনের সূত্রপাত। এরপর দ্রুতই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তিন ফুটের সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে অনেকে বের হয়ে যেতে পারলেও আটকা পড়ে যান চারজন। তাদের মধ্যে আবাসিক হোটেলে ভাড়ায় ওঠা ইসরাফুল আলম সজীব (৪০), সাগর মিয়া (৩৫) ও আলমগীর কবির (৩০) নামে তিনজন বাঁচার জন্য ছয় তলায় উঠে ছাদের গেট খোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাদের গেট বন্ধ থাকায় তাদের বাঁচার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কেউ বের হতে না পেরে গেটের সামনেই দম বন্ধ হয়ে মারা যান তারা। অন্যদিকে বাঁচার জন্য বাথরুমে আশ্রয় নিলেও মিরন জমাদ্দার (৬০) দম বন্ধ হয়ে মারা যান। ছাদ খোলা থাকলে বা জরুরি বহির্গমনের পথ থাকলেই বেঁচে যেত চারটি প্রাণ।



ওই ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের মামলার তদন্ত করে সম্প্রতি আদালতের ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। চার্জশিটে উঠে এসেছে ভবনের মালিকসহ ভাড়া নেওয়া হোটেল ও পার্লারের মালিকদের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় মৃত্যুর ওই মর্মান্তিক ঘটনা। তাই ভবনটির মালিক জহিরুল ইসলাম মজুমদার ও তার ভাই তাজুল ইসলাম, হোটেল সৌদিয়ার মালিক আল আমিন খান অনিক, গোল্ডেন টিউলিপ বিউটি পার্লারের দুই মালিক ফারজানা ফরিদ পুথি ও সাফিয়া আফরিন রিপাকে চার্জশিটভুক্ত আসামি করা হয়েছে। সাক্ষী করা হয় ১৬ জনকে। মামলাটির তদন্ত শেষ করতে ১৩ বার সময় নিয়ে এ চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপপরিদর্শক জাহিদ হাসান। আজ বুধবার আদালতে মামলার চার্জশিট দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে বলে কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন গুলশান থানার জিআরও উপপরিদর্শক মোকতার হোসেন।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, তদন্তকালে ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো সরঞ্জাম দৃষ্টিগোচর হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের রিপোর্ট অনুসারে, ভবনটিতে কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান বা ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। ভবনটির আন্ডারগ্রাউন্ডে একটি দোকান, প্রথম তলায় একটি স্টুডিও এবং একটি হার্ডওয়্যার ও দরজার দোকান। দ্বিতীয় তলায় গোল্ডেন টিউলিপ বিউটি লাউঞ্জ, তৃতীয় তলা থেকে ষষ্ঠ তলার চিলেকোঠা পর্যন্ত হোটেল সৌদিয়া আবাসিক। বিউটি পার্লারে পুরোনো এয়ার কন্ডিশনারসহ পুরাতন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করে ব্যবহার করায় মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন পার্লারে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে আগুনের সূত্রপাত। ভবনটিতে নেভানোর কোনো সরঞ্জাম না থাকায় তাৎক্ষণিক আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। দ্রুতই আগুন ভবনের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, আগুন লাগার পর পরই ভবনটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।


চার্জশিটে আরও বলা হয়, ভবনের মালিক আসামি জহিরুল ইসলাম মজুমদার প্রায়ই দেশের বাইরে থাকায় তার ভাই তাজুল ইসলাম নিয়মবহির্ভূতভাবে জরাজীর্ণ পুরাতন ভবনটি অতিরিক্ত মুনাফার লোভে সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স ছাড়াই ও যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রেখেই সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ভাড়া দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ভাড়াটে হোটেল সৌদিয়ার মালিক আসামি অনিক এবং পার্লারের দুই মালিক পুথি-রিপা তাদের নিজ নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম কোনো ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না রেখে এবং নিয়মিত যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করেই ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। ভবনটিতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সংকীর্ণ সিঁড়ির পাশে হোটেলের রিসিপশন এবং হোটেলের মালপত্র রাখার জন্য করিডোর তৈরি করেন। আসামিদের অবহেলায় অগ্নিকাণ্ডে উল্লিখিত চারজনের মৃত্যু হয় বলে তদন্তে প্রকাশ পায়। তাই আসামিদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৩০৪ (ক)/৩৪ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আসামিদের দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন মামলার বাদী ভুক্তভোগী ইসরাফুল আলমের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম অনিক। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আমার বড় ভাই ব্যবসার কাজে গিয়ে হোটেল সৌদিয়াতে ওঠেন। অগ্নিকাণ্ডে তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। তার স্ত্রীসহ চার বছর ও দুই বছরের দুটি ছোট্ট মেয়ে শিশু রয়েছে। ছোট্ট দুই মেয়ে এতিম হয়ে গেল। চার্জশিটে আমি সন্তুষ্ট। আমার ভাই হত্যার দ্রুত বিচার চাই।’


সাক্ষীর জবানবন্দিতে আরেক ভুক্তভোগী আলমগীর কবিরের ছোট ভাই বলেন, আমার বড় ভাই আলমগীর ব্যবসা করতেন। তিনি অনেক দিন ধরে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ব্যবসার কাজে বিভিন্ন সময় ঢাকায় এসে অবস্থান করতেন। ঘটনার ৫ দিন আগে আমার ভাই আলমগীর কবির ঢাকায় এসে হোটেল সৌদিয়ায় ৪০১ নম্বর রুম ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন। ঘটনার দিন ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিউটি পার্লারে আগুন লাগে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আমার ভাই আলমগীর কবির বাঁচার জন্য আরও দুজনসহ ভবনের ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাদে প্রবেশের গেট তালাবদ্ধ থাকায় কেউ বের হতে পারেননি। হোটেলের ভবনটিতে জরুরি বাইরে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। একটাই সিঁড়ি, তাও অনেক সরু। তার ওপর সিঁড়িতে হোটেল কর্তৃপক্ষ অফিস স্থাপনসহ কেবিনেট স্থাপন করে রাস্তা আরও বন্ধ করে রাখে। আসামিদের অবহেলায় আমার ভাই আলমগীর কবিরসহ আরও তিনজন নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে আসামিদের পক্ষের আইনজীবী আবুল বাশারের বক্তব্য জানতে ওকালতনামায় দেওয়া দুটি নম্বরে একাধিকার কল করেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

দৈনিক রূপালী চট্টগ্রাম