আন্দোলন দমনে নতুন কৌশল বিজেপির, বিক্ষোভ করতে ভাড়া নিতে হবে ময়দান
প্রধান অ্যাডমিন — 2026-10-13T18:09:00.000Z
দিল্লিতে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) চলমান আন্দোলনের মুখে পরিস্থিতি সামাল দিতে বহুমুখী কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকার।মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ জোরদার করেছে। অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার রামলীলা ময়দানের মতো বড় স্থানগুলোকে বিক্ষোভস্থল হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এজন্য পরিশোধ করতে হবে অর্থও। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও তরুণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রেখেছে দলটি। বিজেপির দলীয় সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে একটি ‘তথ্য-বিবরণী’ তৈরির পাশাপাশি জাতীয় রাজধানীতে কথিত ‘নৈরাজ্যের’ অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার চেষ্টা করছে বিজেপি সরকার। নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ থেকে শুরু করে দেশের ভোটার তালিকায় পরিবর্তনের তথ্য- সবই থাকছে ওই বিবরণীতে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর, বিশেষ করে কংগ্রেস, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং আম আদমি পার্টির (এএপি) বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ জোরদার করেছে বিজেপি।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটার বাদ পড়ার প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনের পাল্টা কৌশল হিসেবে বিজেপি ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং ‘জনমিতিক পরিবর্তন’-এর বিষয়টিও সামনে আনার চেষ্টা করছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর এসআইআর সম্পন্ন হওয়া ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে ভোটার তালিকা থেকে ‘বাদ পড়া’ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর সংবাদমাধ্যমটি জানায়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তাদের অজ্ঞাতে নেয়া এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রক্রিয়ার গুরুতর ঘাটতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এরপর যেসব রাজ্যে এসআইআর-সংক্রান্ত দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমা এখনো চলছে, সেসব রাজ্যে প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তারা (সিইও) কতজন ভোটারকে আবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, সে বিষয়ে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করছে নির্বাচন কমিশন।
সোমবার দিল্লির প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ২০২৬ সালের এসআইআর নিয়ে একটি বার্তা প্রকাশ করেন। এতে বলা হয়, দিল্লির ১ কোটি ৪৫ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
বার্তায় বলা হয়, দিল্লির ভোটার তালিকায় প্রায় ৩৩ লাখ এন্ট্রি যৌক্তিক অসংগতি বা মানচিত্রায়ণ না হওয়ার কারণে চিহ্নিত হয়েছিল। এসব সমস্যা সমাধানে আগাম উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৩৩ লাখের মধ্যে প্রায় ২০ লাখের সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির অভিযোগ থাকলে ১৪ হাজার ৯৪৭ জন বুথ লেভেল কর্মকর্তা (বিএলও), ৯০২ জন সহকারী নির্বাচচি নিবন্ধন কর্মকর্তা (এইআরও), ৭০ জন নির্বাচনি নিবন্ধন কর্মকর্তা (ইআরও), ১৩ জন জেলা নির্বাচনি কর্মকর্তা (ডিইও) অথবা প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। বার্তায় বলা হয়, কোনো যোগ্য ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে না।
এসআইআরের আওতায় ব্যাপক হারে ভোটার বাদ পড়েছে- এমন রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তারাও একই ধরনের বার্তায় যোগ্য ভোটারদের তালিকার বাইরে না রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে রাজ্যের ২৪ জন উপনির্বাচনি কর্মকর্তা বিশেষ উদ্যোগ শুরু করেছেন। বিহারের প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাজ্যের ৩৮ জন জেলা নির্বাচনি কর্মকর্তা একই কাজ করছেন এবং এ উদ্দেশ্যে ৯০ হাজারের বেশি বিশেষ ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিক্ষোভের স্থান বদল, ফি নির্ধারণ
একাধিক বিক্ষোভ এবং পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীদের কঠোর পদক্ষেপে নয়াদিল্লির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কয়েক দিন পর সোমবার বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণে পরিবর্তন আনা হয়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমার একটি স্থায়ী আদেশ জারি করেন। এতে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে জন্তর মন্তরের স্বীকৃতি বাতিল করে তিনটি নতুন স্থান নির্ধারণ করা হয়- মধ্য দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান।
তবে এই স্থানগুলোতে বিক্ষোভ আয়োজন করতে হলে এখন থেকে অর্থ খরচ করতে হবে। রামলীলায় একদিনের খরচ ১ লাখ ২১ হাজার ৮০ রুপি। এর ওপর ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’ ৫৫ হাজার রুপি। পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানের ভাড়া ১ লাখ ৮৭ হাজার রুপি ও সিকিউরিটি ডিপোজিট ৯৫ হাজার। তবে উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দানের ভাড়া কত তা জানানো হয়নি।
শুধু অর্থ খরচের প্রশ্নই নয়, নতুন তিন জায়গায় বিক্ষোভকারীরা চাইলেই অবস্থান করতে পারবেন না। জায়গা খালি আছে কি না, সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। সেই অনুযায়ী বিক্ষোভ কর্মসূচি করতে হবে।
রামলীলা ময়দানে ককরোচ জনতা পার্টিকে (সিজেপি) বিক্ষোভের আয়োজন করতে এই বছরের মাত্র তিনটি দিন তাদের জন্য বরাদ্দ হতে পারে। সেই তিনটি দিন হচ্ছে ডিসেম্বরের ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখ। কেননা বাকি সব দিন সেখানে কিছু না কিছু হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ
এ বছরের জুন-জুলাইয়ে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জন্তর মন্তরে সিজেপির আন্দোলনের সময় কেন্দ্রীয় সরকার দলটির সঙ্গে আলোচনা করেছিল। ওই আন্দোলনের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। সে সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং সিজেপি নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করেন। শেষ পর্যন্ত সমঝোতার মাধ্যমে আন্দোলনের অবসান ঘটে।
এরপর সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাস করে নরেন্দ্র মোদি সরকার। পাশাপাশি জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (এনটিএ) পুনর্গঠন করা হয় এবং ইনফোসিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে পরীক্ষা সংস্কারবিষয়ক একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
দিল্লির বর্তমান অচলাবস্থা প্রসঙ্গে বিজেপির এক সূত্র বলেছে, ‘দেশের আইন স্পষ্ট এবং সবার জন্য প্রযোজ্য। সরকার কেবল আইনের বিধান বাস্তবায়ন করছে। সড়কে বিক্ষোভ কিংবা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রশ্ন- সবকিছুই নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী হতে হবে। অভিশংসন ছাড়া সিইসিকে অপসারণ করা সম্ভব নয়।’
দলটির আরেকটি সূত্র জানায়, এসআইআর নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে নির্বাচন কমিশন পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে অত্যন্ত স্পর্শকাতর নয়াদিল্লি এলাকা থেকে তরুণ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সরকার সংযম দেখিয়েছে এবং কোনো ফৌজদারি বা দণ্ডমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের বিক্ষোভ করার অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ওই সূত্র আরও বলে, ‘মোদি সরকার যদি সত্যিই মানুষের মৌলিক বিক্ষোভের অধিকারের বিরোধী হতো, তাহলে রামলীলা ময়দানের মতো স্থানগুলোকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হিসেবে ঘোষণা করত না। এর ফলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রাস্তায় একটি অংশের মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয় না।’
দৈনিক রূপালী চট্টগ্রাম