শিশুর ডিএনএ টেস্টের দাবি, চাইলেই কি বাংলাদেশে এই পরীক্ষা করা যায়?

প্রধান অ্যাডমিন — 2026-10-13T05:46:00.000Z

বাংলাদেশে কোনো শিশুর পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষা করতে চাইলেই তা করা যায় না। এ ধরনের ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করতে হলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত আদালতের নির্দেশ অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সরকারি নির্ধারিত পরীক্ষাগারে এই পরীক্ষা করা হয়। 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিঠাই’ নামের একটি ফেসবুক পেজে পরিচিত এক শিশুকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এক দম্পতি শিশুটিকে নিজেদের সন্তান বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, শিশুটির বর্তমান পরিবার এ দাবি অস্বীকার করেছে। এ ঘটনায় শিশুটির পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার দাবি উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চাইলেই কি শিশুর ডিএনএ পরীক্ষা করানো সম্ভব?

শিশুটিকে নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার আলোচনা কেন?

সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবিতে ঢাকার সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘আমার সন্তান কোথায়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন করে জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন। ওই সংবাদ সম্মেলনে কামরাঙ্গীর চরের একটি নিখোঁজ শিশুর পরিবার উপস্থিত ছিল। পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালে বাসার সামনে খেলতে গিয়ে শিশুটি নিখোঁজ হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিঠাই’ নামের একটি পেজে শিশুটিকে দেখতে পান বলে দাবি করেন তারা। 

পরিবারটির অভিযোগ, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিখোঁজের ঘটনায় করা মামলাটি ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) গেলেও শিশুটির সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি তাদের। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটিকে নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়। শিশুটিকে নিজের সন্তান দাবি করে এক নারী ডিএনএ পরীক্ষার দাবি জানান।

অন্যদিকে, শিশুটির বর্তমান মা ‘মিঠাই’ নামের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার দাবি, প্রায় দেড় বছর ধরে ওই নারী তাদের পরিবারকে হয়রানি করছেন। শিশুটির জন্মের সময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি প্রকাশের সময় উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, নিখোঁজ শিশুটির সঙ্গে তাদের সন্তানের পরিচয় মেলে না। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও আইনগত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হলো জীবের জিনগত তথ্য বহনকারী উপাদান। সন্তান তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে জিনগত বৈশিষ্ট্য পায়। ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জৈবিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা সম্ভব। সাধারণত গালের ভেতরের কোষ থেকে সোয়াব নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ করে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়।

ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান জানান, ডিএনএ পরীক্ষার প্রধান দুটি ধরন হলো ফরেনসিক ও ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা। খুন, ধর্ষণের মতো অপরাধের তদন্ত কিংবা অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্ত করতে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। অন্যদিকে, জিনগত ত্রুটি, বংশগত রোগ বা নির্দিষ্ট রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করতে ডায়াগনস্টিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এ ধরনের কিছু পরীক্ষা বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও করা যায়।

কোথায় এবং কীভাবে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করতে হয়  

বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে। এর একটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডির) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি। অন্যটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে চাইলেই এসব পরীক্ষাগারে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করানো যায় না। এ জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

কোনো শিশুর বাবা-মায়ের পরিচয় জানতে হলে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাতে হয়। ছবি: সংগৃহীত

ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বলেন, কোনো শিশুর বাবা-মায়ের পরিচয় জানতে হলে সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অথবা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করাতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে মামলা থাকতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার জন্যই এসব পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মামলা ছাড়া সেখানে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, আদালতের নির্দেশ ছাড়া সিআইডির ল্যাবরেটরিতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় না। তিনি বলেন, পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরাসরি ঢাকার বিচারিক আদালতে মামলা করা যায়। আবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করেও আদালতের নির্দেশ চাওয়া যায়। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরই সিআইডি এ ধরনের পরীক্ষা করে থাকে বলে জানান তিনি।

আর কোন ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়?

পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণ ছাড়াও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। আবু সুফিয়ান জানান, বিদেশে বসবাসরত কোনো বাবা তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিজের কাছে নিতে চাইলে অভিবাসনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কখনো কখনো ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা করা হতে পারে।

এ ছাড়া বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতার আত্মীয়তার সম্পর্ক নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ, শিশুর পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে কেবল ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষার অনুরোধ করলেই হবে না। বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। থানায় জিডি বা মামলা করা কিংবা সরাসরি আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার মাধ্যমে ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ চাওয়া যেতে পারে। আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট সরকারি পরীক্ষাগারে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

সূত্র: বিবিসি 
দৈনিক রূপালী চট্টগ্রাম