১৯৪৭ সালে আকাশ থেকে ঝরেছিল মাছ! রহস্যময় সেই ঘটনার নেপথ্যে কী?
প্রধান অ্যাডমিন — 2026-10-12T05:14:00.000Z
একদিন হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে যদি দেখা যায়, আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে মাছ; তাহলে দৃশ্যটি কেমন হবে? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এমনই এক অদ্ভুত ঘটনার কথা জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মার্কসভিল শহরে। ১৯৪৭ সালের ২৩ অক্টোবর সেখানে আকাশ থেকে মাছ পড়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করার দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে ঘটনাটি নথিবদ্ধ করেন স্বাদুপানির মাছবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. আলেকজান্ডার দিমিত্রিয়েভিচ বাজকভ। খবর হিন্দুস্তান টাইমসের। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে স্ত্রী ভার্জিনিয়ার সঙ্গে একটি স্থানীয় খাবারের দোকানে নাশতা করছিলেন বাজকভ। এ সময় এক ওয়েট্রেস তাদের জানান, বাইরে আকাশ থেকে মাছ পড়ছে।
খবরটি শুনে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন তারা। এরপর শহরের আদালত ভবনের আশপাশে মাছ ছড়িয়ে থাকতে দেখেন। মাছগুলো প্রায় ১ হাজার ফুট দীর্ঘ এবং ৮০ ফুট প্রশস্ত এলাকাজুড়ে পড়ে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পক্ষে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার বক্তব্যও পাওয়া যায়। ব্যাংক পরিচালক জেমস বারহাম তার বাড়ির উঠানে মাছ পড়ে থাকতে দেখেন বলে জানান। প্রতিবেশী এলিজাবেথ জোফ্রিয়ন ও এডি গ্রেমিলিয়নও একই ধরনের দৃশ্যের বর্ণনা দেন।
এমনকি প্রধান সড়ক দিয়ে হাঁটার সময় আকাশ থেকে পড়া মাছ শরীরে এসে আঘাত করেছিল বলে দাবি করেন দুই দোকানি; ইমানুয়েল ব্ল্যাঞ্চার ও জে এম ব্রুইয়েট।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় গবেষণার কাজে ছিলেন বাজকভ। মাছ পড়ার খবর পেয়ে তিনি নমুনা সংগ্রহ করতে শুরু করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বর্গগজ এলাকায় প্রায় একটি করে মাছ পড়েছিল।
সেই মাছগুলোর মধ্যে ছিল ওই অঞ্চলের বিভিন্ন স্বাদুপানির প্রজাতি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য; বাস, সানফিশ, মিনো এবং হিকরি শ্যাড।
উদ্ধার করা মাছগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ছিল একটি লার্জমাউথ বাস। এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪ সেন্টিমিটার। আশ্চর্যের বিষয়, বাজকভের মতে, মাছগুলো এতটাই তাজা ছিল যে সেগুলো খাওয়ার উপযোগী বলে মনে হয়েছিল।
আকাশ থেকে মাছ পড়ার ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাজকভ একে অলৌকিক কিছু হিসেবে দেখেননি। বরং এর পেছনে প্রাকৃতিক কোনো কারণ থাকতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন তিনি।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আকাশ থেকে মাছ পড়ার একাধিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া গেছে। ১৯৪৬ সালে ইকথিওলজিস্ট ই ডব্লিউ গাডজার এ ধরনের ৭৮টি নথিভুক্ত ঘটনার পর্যালোচনা করেছিলেন।
এমন ঘটনা শুধু অতীতেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়ার লাজামানু শহরেও ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আকাশ থেকে মাছ পড়ার খবর পাওয়া যায়।
কীভাবে আকাশ থেকে পড়তে পারে মাছ?
মার্কসভিলের ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বাজকভ একটি জলস্তম্ভ বা ওয়াটারস্পাউটের কথা বলেছিলেন। এটি হলো পানির ওপর তৈরি হওয়া ঘূর্ণায়মান বায়ুস্তম্ভ, যা অনেকটা পানির ওপরের টর্নেডোর মতো দেখতে।
তার ধারণা ছিল, এ ধরনের ঘূর্ণিবায়ু অগভীর জলাশয় থেকে ছোট মাছ পানিসহ ওপরে তুলে নিতে পারে। পরে বাতাসের সঙ্গে মাছগুলো অন্য কোনো স্থানে চলে গিয়ে মাটিতে পড়ে যেতে পারে।
তবে ওই দিন মার্কসভিলে টর্নেডো বা ঝড়ের কোনো সরকারি আবহাওয়া-সংক্রান্ত নথি পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার আগের দিন বাজকভ ও তার সহগবেষক ড. জেমস গোয়ানলক আশপাশের জলাভূমি এলাকায় জলস্তম্ভ ও ধূলিঝড়ের মতো ঘূর্ণিবায়ু দেখেছিলেন।
১৯৪৯ সালে প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে বাজকভ তার যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘অনেক মানুষ কখনো টর্নেডো দেখেননি, কিন্তু তারা টর্নেডোর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করেন না। তারা মেনে নেন যে বাতাস ভারী বস্তুও তুলে নিয়ে যেতে পারে। তাহলে মাছ পানিসহ বাতাসে উঠে ঘূর্ণিবায়ুর সঙ্গে অন্যত্র চলে যেতে পারবে না কেন?’
বাজকভের তত্ত্বটি ঘটনাটির একটি সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়। তবে ১৯৪৭ সালের ওই দিন মার্কসভিলে ঠিক কী কারণে মাছ পড়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
প্রাকৃতিক ঘূর্ণিবায়ু মাছকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতে পারে; এমন ব্যাখ্যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিবেচনাযোগ্য। কিন্তু মার্কসভিলের ঘটনার ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়াই মূল কারণ ছিল কি না, তা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। প্রায় আট দশক আগের এই ঘটনা তাই আজও প্রকৃতির অদ্ভুত ও বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে আলোচনায় আসে।
রূপালী চট্টগ্রাম।