নিজের গ্রামে পাকা বাড়ি, তবু ‘উদ্বাস্তু’ পরিচয়ে সরকারি বাসভবন দখল!
প্রধান অ্যাডমিন — 2026-10-06T14:29:00.000Z
নাছিরাবাদের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের বাড়িতে ৬-৭ বছর ধরে বসবাস ইদ্রিছের, আদালতের রায়েও ছাড়েননি বাসা
মনিরুল ইসলাম মুন্না
নিজ গ্রামে রয়েছে বসতভিটা, পুকুর ও পাকা বাড়ি। অথচ নিজেকে ‘উদ্বাস্তু’ পরিচয়ে চট্টগ্রাম নগরের নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত একটি বাসভবন দীর্ঘ ৬-৭ বছর ধরে দখলে রাখার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ ইদ্রিছের বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করে উদ্বাস্তু সনদ তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই পরিচয়ের ভিত্তিতে সরকারি বাসভবনে থাকার সুযোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
গণপূর্ত বিভাগের দাবি, বাসভবনটি খালি করে দেওয়ার বিষয়ে আদালতের রায়ও হয়েছে। তাঁকে একাধিকবার বাড়ি ছাড়ার জন্য বলা হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ ও ওয়াসার সংযোগ বিচ্ছিন্নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো বাসাটি দখলমুক্ত হয়নি। ফলে সরকারি জায়গাটিতে নতুন ভবন নির্মাণের কাজও আটকে আছে।
নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির রোড নম্বর-২-এর ৫ নম্বর বাড়িটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছেন মোহাম্মদ ইদ্রিছ। কীভাবে একজন সাধারণ ব্যক্তি ওই সরকারি আবাসিক ভবনে থাকার সুযোগ পেলেন, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
স্ত্রী সরকারি চাকরিতে, এরপর ‘উদ্বাস্তু’ পরিচয়ে দাবি
চট্টগ্রাম গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জিতুর ভাষ্য অনুযায়ী, ইদ্রিছের স্ত্রী শিক্ষক থাকাকালে আবেদনের মাধ্যমে ওই বাসভবনে থাকার সুযোগ পান। পরে স্ত্রী অবসরে গেলে ইদ্রিছ নিজেকে উদ্বাস্তু ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে বাসাটি ধরে রাখার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলাও করেন তিনি।
মনিরুজ্জামান জিতু বলেন, ‘এটা সরকারের পরিত্যক্ত সংরক্ষিত বাড়ি। মোহাম্মদ ইদ্রিছের স্ত্রী যখন শিক্ষিকা ছিলেন, তখন তাঁর স্ত্রী আবেদনের মাধ্যমে সেখানে থাকার সুযোগ পান। এরপর স্ত্রী যখন অবসরে চলে যান, তখন তিনি উদ্বাস্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে রায়ের মাধ্যমে বাড়িটি খালি করে দেওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৬-৭ বছর হলেও এখনো তিনি দখল করে আছেন।’
তিনি বলেন, ‘তাঁকে বারবার ছাড়তে বলা হলেও তিনি আমাদের কাছে বিকল্প একটি বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার দাবি করছেন। আইনগতভাবে সেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পরে বিদ্যুৎ ও ওয়াসাকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য জানিয়ে দিই। কিন্তু তিনি এখনো পানি ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে রায় আমাদের পক্ষে এসেছে। ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই আমরা উচ্ছেদের দিকে যাব।’
মাহাতায় বাড়ি, পুকুর ও ভিটেমাটি
ইদ্রিছের গ্রামের বাড়ি আনোয়ারা উপজেলার মাহাতা গ্রামে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, সেখানে তাঁর নিজস্ব জায়গা-সম্পত্তি, পুকুর, বসতভিটা ও বাড়িঘর রয়েছে। বর্তমানে সেখানে পাকা ভবনও রয়েছে।
অন্যদিকে ইদ্রিছের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্যে এ দাবির সঙ্গে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
আনোয়ারা উপজেলার ৯ নম্বর পরৈকোড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আখতার জামাল চৌধুরী বাবু বলেন, ‘আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে হয়তো তিনি উদ্বাস্ত পরিচয় দিয়েছেন। আমি দীর্ঘ ২৮ বছর চেয়ারম্যান ছিলাম। এ সময়ে আমার কাছ থেকে তিনি কোনো সার্টিফিকেট নেননি। তাছাড়া তাঁর ঘর-বাড়ি সবই আছে।’
বর্তমান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোরশেদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘উনার জায়গা-সম্পত্তি, পুকুর, ভিটামাটি আছে। উনার কিছু নাই বললে সেটা তো হবে না। আমরা ছোটকাল থেকে দেখে আসছি।’
‘যুদ্ধের সময় বাড়িতে হামলা হয়নি’
ইদ্রিছ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও দাবি করেন এবং সরকারি ভাতা গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর এই পরিচয় নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন আহমদ শাহ বলেন, ‘আমরা একসাথে যুদ্ধ করেছিলাম। যুদ্ধের সময় তার কোনো বাড়িতে হামলা হয়নি। সে জাল-জালিয়াতি করে কাগজপত্র বানিয়ে হাইকোর্টে রিট করে, যাতে বাড়িটি সে দখল করে আজীবন ভোগ করতে পারে। প্রশাসনের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।’
‘সনদ জালিয়াতি’ অভিযোগের সত্যতা যাচাই জরুরি
ইদ্রিছের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, স্থানীয় চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর জাল করে নিজেকে উদ্বাস্তু প্রমাণের জন্য সনদ তৈরি ও দাখিল করা। ওই সনদের ভিত্তিতেই সরকারি আবাসনের সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও সনদের ফরেনসিক বা প্রশাসনিক যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান আখতার জামাল চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ইদ্রিছকে কোনো উদ্বাস্তু সনদ দেননি এবং তাঁর স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা জালিয়াতির পর্যায়ে পড়ে।
সরকারি বাড়ি ছাড়লে নির্মাণকাজ শুরু হবে
গণপূর্ত বিভাগের দাবি, ইদ্রিছের দখলে থাকা বাড়িটির কারণে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জিতু বলেন, ‘শুধু উনার কারণে আমরা ওখানে নতুন ভবনের কাজ করতে পারছি না। যদি উনি চলে যেতেন, তাহলে আমরা দ্রুত ভবনের কাজ ধরতে পারতাম।’
অর্থাৎ, একটি সরকারি আবাসিক ভবন নিয়ে ব্যক্তিগত দখল ও আইনি জটিলতার কারণে সরকারি সম্পদ ব্যবহারের পাশাপাশি উন্নয়নকাজও আটকে রয়েছে বলে দাবি গণপূর্ত বিভাগের।
চাঁদাবাজির অভিযোগও
ইদ্রিছের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজির অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজা মিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময়কালে ইদ্রিছ সমাজকল্যাণ পরিষদ গঠন করে ১৫ আগস্ট ও ১৬ ডিসেম্বর ম্যাগাজিন তৈরির নাম দিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি করতো। দুইটি স্মরণিকা প্রকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা কামিয়ে নিতো। এখন আবার সেভাবে শুরু করেছে।’
আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এম. নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের সভাপতি দাবি করে তিনি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করেছেন। অথচ তিন বছর আগে আমরা নির্বাচিত হয়েছি। সরকারি বাড়িটিও তিনি দখল করে আছেন।’
ইদ্রিছের বক্তব্য
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ ইদ্রিছের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আপনাকে কেউ নিউজ দিয়েছে বুঝতে পেরেছি। আমি আগামীকাল আপনার সঙ্গে দেখা করবো।’
তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি আর বিস্তারিত বক্তব্য দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা উদ্বাস্তু পরিচয়, সনদ জালিয়াতি, সরকারি বাসভবন দখল ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিজ গ্রামে বসতভিটা ও পাকা বাড়ি থাকা সত্ত্বেও কোন নথি ও কোন প্রক্রিয়ায় একজন ব্যক্তি উদ্বাস্তু হিসেবে সরকারি বাসভবনের সুবিধা পেলেন, সেই নথি যাচাই হয়েছিল কি না এবং আদালতের রায়ের পরও কেন এত বছর ধরে সরকারি বাড়িটি দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের যাচাই ও প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।